দেশে কি গণতন্ত্র এসে গেছে?

গত ২৯ ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক নির্বাচনের পর আমরা অনেকেই আশা করছি দেশে গণতন্ত্র আসবে, আরো সুন্দর রূপে, আরো কার্যকর রূপে। সেই গণতন্ত্রের পথে আমাদের অগ্রগতি কতটুকু ঘটল তা মাপবার সময় হয়ত এখনও আসেনি। তবে মনে হয় আমরা গণতন্ত্রের পথেই যাচ্ছি! কয়েকটি ঘটনা দেখে অতিপরিচিত লাগছে এবং মনে হচ্ছে আমরা অনির্বাচিত সরকার থেকে এখন গণতান্ত্রিক সরকারের (আগে যেমন ছিল) এসে গেছি। কেন মনে হলো বলে ফেলি।

ব্যবসা, সবটাই
ধানমন্ডি অর্কিড প্লাজার পাশে বেস্ট ফ্রায়েড চিকেন নামের যে দোকানটি আছে তা গড়ে উঠেছিল মার্কেটের ভুতলে – গাড়ি পার্কিং জায়গায়। ১/১১ এর পর সেটিকে সরিয়ে দেয়া হয়, তারা নিচের পাততাড়ি গুটিয়ে উপরের সংকীর্ণ জায়গাটিতেই এতদিন ব্যবসা করে আসছিল। এতে যে তাদের ব্যবসার কিছুটা অসুবিধা হচ্ছিল তা বলাবাহুল্য, বিশেষ করে তরুন-তরুণীর দল সেখানে বসে তাদের সময় কাটাতে পারছিল না এবং সে কারণে ওই দোকানের ব্যবসাও কমে গিয়েছিল। সরকার বদলের সাথে সাথে দেখলাম দোকানটি আগের মতোই হয়েছে। তারা আবার ভূগহ্বরে চলে গেছে – এবং আগের মতো রমরমা ব্যবসা করছে। গণতান্ত্রিক ব্যবসা-বান্ধব সরকারের জন্যই সম্ভবত এটি হয়েছে! তবে পার্কিঙের স্থান দখল করার ফলে অন্যদের অসুবিধা হচ্ছে কি না কিংবা রাস্তায় পার্কিঙের জন্য পথচারীদের অসুবিধা হচ্ছে কি না সেটি হয়ত পরে দেখা হবে!

কে বলে নেতা নেই?
আমাদের অনেক বড় বড় নেতা এতদিন আত্মগোপণে থাকতে বাধ্য হচ্ছিলেন, এখন তারা বেরিয়ে আসছেন, এবং যথারীতি দলীয় সভায় যোগ দিচ্ছেন। অগণতান্ত্রিক সরকার এইসব নেতাদের দেশসেবা হতে বঞ্চিত করেছিল, গণতান্ত্রিক সরকার তাদের সুযোগ করে দিচ্ছে। এখন শীঘ্রই তাদের আমরা মিছিলের সম্মুখভাগে দেখতে পাব (পেছনে অস্ত্র উঁচিয়ে পাহারাদারও থাকতে পারে, মহান নেতার নিরাপত্তার জন্য; কিংবা স্বনির্ভর নেতাগণ নিজেরাই আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন)।

সংসদ-বিতর্ক-ওয়াকআউট, গণতান্ত্রিক অধিকারের চর্চা
আমরা গণতন্ত্রে পৌঁছে গেছি তার বড় প্রমাণ কয়েকদিন হলো সংসদ অধিবেশন শুরু হয়েছে, এবং গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুসারে বিরোধীদল তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্বাধীন-সার্বভৌমভাবে প্রয়োগ করছে। সংসদ এখন বিরোধীদলশূণ্য, এতদিন নেতার বসে থেকে – জেলে, বাসায়, আত্মগোপণে – তাদের শরীরে যে মেদ জমেছে তা কমানোর জন্য নিয়মিত ওয়াকআউট করছেন।

গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সবার জন্য সাইকোথেরাপি

আজ এক সরকার হাসপাতালে গিয়ে দেখলাম টিকেট কাউন্টারে লোক নেই – ২৫ মিনিট পরে তাকে পাওয়া গেল। তবে যেদিকে তাকাই ওষুধ কোম্পানির লোকের অভাব নেই, রোগী দেখামাত্র তারাই ছেঁকে ধরছেন, কী সমস্যা, কী ওষুধ খাচ্ছেন, কতদিন খাচ্ছেন, কোন ডাক্তার দিয়েছে – ইত্যাদি তথ্য জানতে চাইছেন। তাদের এই অনবদ্য স্বেচ্ছাসেবা দেখে রোগীরা শীঘ্রই বাড়ি ফেরার জন্য আকুল হয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্যখাতে বেসরকারীখাতের অংশগ্রহণের একটি বড় উদাহরণ হতে পারে এটি! টিকেট পাওয়া গেলেও পরে ডাক্তার পাওয়া গেল না । ডাক্তার সাহেব আধা ঘণ্টা আগে চা পান করতে গেছেন। তাই পাশের ডাক্তারের কাছে উকি দিতে গেলাম। তিনি মহানন্দে ধূমপান করছেন, সেই ধূয়ায় বারান্দায় দাঁড়ানো যাচ্ছে না। আরেক ডাক্তারকে বিষয়টি জানালে তিনি একটু হেসে বললেন, উনাকে থামানো যায় না, যতক্ষণ থাকেন ধূমপান করেন। ধূমপানের জন্য জরিমানা হিসেবে ৫০ টাকা কম হলেও, এই ডাক্তারকে জরিমানা করে সরকার বিপুল পরিমাণ আয় বাড়াতে পারেন। কারণ তিনি যতক্ষণ হাসপাতালে থাকেন ততক্ষণ ধূমপান করেন, তার ছড়ানো ধোঁয়া অন্যরাও পান করতে বাধ্য হন। তাই সেই ডাক্তারের পাশাপাশি অন্যদেরকেও জরিমানা করা যেতে পারে, এতে কোনো পুলিশ ভাইয়ের পুরো মাসের বেতন সংস্থান হতে পারে। সেই ডাক্তার না পাওয়ার পর আরো বড় ডাক্তারের নিকট গেলাম। অবশ্য একটু বেগ পেতে হলো। উনি একটু বিরক্ত হলেন অসময়ে বিরক্ত করার জন্য। কারণ তিনি এখন খুবই ব্যস্ত, বই লিখছেন, বইমেলায় বেরুবে। তার আগে পিছে আরো দুজন কর্মচারী দাঁড়িয়ে, তারা বইয়ের কম্পোজ ও প্রুফ দেখার কাজ করছেন।
ডাক্তার সাহেব রোগীর দিকে তাকালেন।
– কী সমস্যা?
– সমস্যা হলো আমি হঠাৎ করেই রেগে যাই।
– কেন রেগে যান?
– রেগে যাই কোনো অন্যায় কাজ দেখলে।
– আপনাকেতো এখনো রাগান্বিত দেখছি, ব্যাপার কী? এখানে তো রাগার মতো কোনো কারণ দেখি না।
– আপনি দেখতে পাননা, কিন্তু আমি দেখতে পাই। এই যে আপনারা এখানে যা করছেন তা কি ঠিক?
– মানে, এই যে আপনি অফিসে বসে বসে বই লিখছেন, এই অফিসের কর্মচারীদের কাজে লাগিয়ে – এটা কি ঠিক?
– আমি এটা করছি দেশের জন্য। এটা পড়ে দেশের লোকজন উপকৃত হবে। সবাইতো এই হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিতে পারবে না, এই বই তাদের সাহায্য করবে।
– তা বুঝলাম, কিন্তু এটি কি আপনার কাজের ক্ষতি করছে না? মানে, রোগীরা আসলে আপনি কি তাদের সময় দিতে পারেন।
– কেন পারব না, এইতো আপনাকে দিচ্ছি।
– তা দিচ্ছেন, কিন্তু অনিচ্ছায়, এবং মনে মনে চাচ্চেন আমি যত শীঘ্র যাই ততই ভাল।
এবার ডাক্তার সাহেব চোখ বড় বড় করে তাকালেন।
– আচ্ছা, আপনি নাহয় সময় দিচ্ছেন। কিন্তু নিচে এক ডাক্তারকে পেলাম না আধা ঘন্টা অপেক্ষা করেও। টিকেট নিতে সময় লেগেছে ২০ মিনিট, এই ২০ মিনিট উনি কোথায় ছিলেন কেউ জানে না। আরেকজন ডাক্তার হাসপাতালে বসে সিগারেট টেনে যাচ্ছে, এবং অন্যদেরও নিকোটিন গ্রহণ করতে বাধ্য করছে। এসব দেখে কী রাগ করা অন্যায় হবে?
– ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্ন নয়, ব্যাপার হলো আপনি এসব দেখে রাগ করে কোনো লাভ নেই। এতে আপনার ক্ষতি। ভাল হয় যদি আপনি এসব না দেখেন, আর দেখলেও কোনো কথা না বলেন, আর কোনো কথা বলতে হলেও যদি মিষ্টি কথা বলেন। আর সবচেয়ে ভাল হয় যদি আপনি আর সবার মতো হয়ে যেতে পারেন।
– সেটি কীভাবে হওয়া যায় বলবেন?
– সাইকোথেরাপির কাজ হলো আপনাকে সাহায্য করা, যাতে আপনিই সেই পথ বেছে নিতে পারেন। আমরা আপনাকে সাহায্য করতে পারি মাত্র। এই যেমন আমি বললাম, এসব করলে ভাল হয়। কীভাবে করবেন সেটা আপনার ব্যাপার। আমি বলছি আপনার চিন্তাকে বদলাতে হবে, আপনার সহ্যক্ষমতা বাড়াতে হবে, কোনো ‘অন্যায়’ দেখে উত্তেজিত হওয়া চলবে না। আপনি যেটাকে অন্যায় ভাবছেন সেটি অন্যায় নাও হতে পারে। আপনি যদি ভাবেন আপনার চারপাশের বেশিরভাগ লোক অন্যায় করছে তাহলে আপনি টিকতে পারবেন না। আর বড় কথা হচ্ছে বেশিরভাগ লোক যা করে তা অন্যায় নয়, অন্যায় করে মুষ্টিমেয় লোক। আপনি যদি দলে ভারী না হোন, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যাটি আপনার মাঝেই।
– তাহলে আপনি বলতে চাইছেন ন্যায়-অন্যায় ব্যাপারটা সংখ্যার উপর নির্ভর করে? যে দল ভারী তার নীতিই ন্যায়, আর সংখ্যালঘুর নীতি ন্যায় সংগত নয়?
– না, আমি তা বলতে চাইছি না। আমি যা বলতে চাইছি তা তা আপনি বুঝতে চাইছেন না, কারণ আপনার মনের মধ্যে ‘ন্যায়’ নামক এক ভ্রান্ত ধারণা বদ্ধমূল হয়ে আছে। আপনি সেটিকে উপরে না ফেললে আপনি নিজে শান্তিতে থাকতে পারবেন না, এবং অন্যদের শান্তিও বিঘ্নিত করবেন।
– তাহলে আমাকে এখন কী করতে হবে?
– আবার প্রশ্ন করছেন কী করতে হবে? এতক্ষণ কী বোঝালাম – আপনার ‘ন্যায়’ আর ‘অন্যায়’ শব্দদুটো ভুলে যেতে হবে। নিজে কাজ করার সময় এটি ভাববেন, অন্যের কাজের বেলায়ও এসব খুঁজতে যাবেন না।
– কিন্তু সেটি কীভাবে করব? আপনার কাছে এসেছি সেটি জানতে – কেমন করে ভুলে যাব।
– আগেও বলেছি, এখনও বলছি, মনোচিকিৎসক হিসেবে আমরা কোনো পন্থা বেঁধে দিতে পারি না। আমরা কিছু সম্ভাবনার কথা বলতে পারি । যেমন আপনি এতদিন যা শিখেছেন সব ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। আপনার স্মৃতিতে যা জমে আছে সেটিকে মুছে ফেলতে পারেন। আগে কে কী করেছে সেটি ভুলে যেতে পারেন এ মুহূর্তেই। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে আপনাকে চেষ্টা করতে হবে নুতন কিছু না জানার। জানার অনেক বিপদ, যত জানবেন তত সমস্যা। আসলে জ্ঞান বলে কিছু নেই – সবটাই ধারণা! কেউ মনে করে সে জ্ঞানী – আসলেই কি সে জ্ঞানী? সত্য-মিথ্যা কোনোটাই বলা যাবে না, কারণা জ্ঞান বলতে আমরা যা বুঝি সেটাই পরিষ্কার না। জ্ঞান তো কোনো বস্তু না, এটি দেখা যায় না। আপনি নিজেকে জ্ঞানী মনে করলেই জ্ঞানী, না করলেই না। হীরক রাজার দেশে ছবিটি দেখেছেন? আপনার সবসময় মনে রাখতে হবে – জানার কোনো শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই
– জ্বি, চেষ্টা করব। আর কিছু করতে হবে?
– হ্যাঁ, আর চেষ্টা করবেন আমি যা বললাম তার প্রচার করতে। যত বেশি লোক আমার এসব পরামর্শ শুনবে দেশের ততই মঙ্গল। এজন্যই আমি এবারেই বইমেলার জন্য লিখছি সবার জন্য সাইকোথেরাপি – শান্তিতে বাঁচার উপায়। পারলে আপনার পরিচিতজন ও বন্ধুবান্ধবদের এটি কিনতে বলবেন।
– জ্বি, স্যার। কিনতে বলব। আমিও কিনব। এবার আসি।
– জ্বি, আসেন।
– যাবার বেলাই, আরেকটা কথা মনে পড়ে গেল। বলব?
– বলুন।
– হীরক রাজার দেশের মতো যন্তর মন্তর ঘর নেই আপনাদের এখানে?
– কেন বলুন তো?
– এই যে আপনি বই লিখছেন, এত চেষ্টা করছেন সবার মগজ ধোলাই করার জন্য – সেটি যন্তর মন্তর ঘরের মাধ্যমে সহজ হয়ে যেত না?
– হ্যাঁ, তা যেত। বিষয়টা নিয়ে আমিও ভাবছি। সত্যজিৎ রায় বেঁচে থাকলে জেনে নেয়া যেত আসলে যন্ত্রটি তিনি কোথায় দেখেছিলেন। তবে আমি চেষ্টা করছি সেরকম কোনো যন্ত্র বানানোর। তাহলে আমাদের এই সেন্ট্রাল মেন্টাল হসপিটালের অনেক কাজই সহজ হয়ে যায়। রোগী আসবে আর আমরা তাদেরকে যন্তরমন্তর ঘরে ঢোকাব। তারপর বেরিয়ে আসবে নূতন মানুষ, তাদের কোনো দু:খ থাকবে না, অতীত স্মৃতি থাকবে না, ন্যায় অন্যায় নিয়ে তাদের কোনো দ্বন্দ্বে পড়তে হবে না।
– অনেক ধন্যবাদ স্যার। যন্ত্রটি বানানো হলে আমাকে জানাবেন। আমিও যাব সেই যন্তর মন্তর ঘরে।
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে ভাবতে লাগলাম, আসলেই এরকম একটি যন্ত্র হবে যুগান্তকারী। যিনি বানাবেন, তিনি আজীবনের জন্য নোবেল পুরষ্কার, এমনকি বুশ পুরষ্কারও পেতে পারেন!

[সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: ইহা সত্য-মিথ্যা (যাহা আপেক্ষিক ব্যাপার মাত্র) অবলম্বনে রচিত। তবে শতকরা কতভাগ সত্য, আর কতভাগ মিথ্যা তাহা এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নহে। ]

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s