প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি: তিনটি বিবেচ্য

Download now or preview on posterous

edu_policy_2009.pdf (690 KB)

জাতীয় শিক্ষা কমিশন ইতোমধ্যে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০৯-এর চূড়ান্ত খসড়া দাখিল করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সেটিকে তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে। এবং সেই সাথে একটি সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে এর উপর মতামত জানানোর। ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি সম্পর্কে মতামত জানানো যাবে। এই সময়সীমার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট অনেকেই আপত্তি তুলে আসছিলেন। কারণ এটি প্রকাশের পর খুব অল্পসংখ্যক কার্যদিবস পাওয়া যাবে। ঈদ ও পূজোর ছুটির কারণে অনেকেই সেটি পাঠ ও তারপর সুচিন্তিত মতামত দিতে পারবেন না। অনেকেরই দাবি ছিল মতামত দেয়ার সময়সীমা আরো দু-এক সপ্তাহ বাড়ানোর জন্য। কিন্তু মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত সে ব্যাপারে নীরব। এটি দেখে অনেকেই সন্দিহান সত্যিকার অর্থেই সরকার এটি আলোচনায় আনতে চায় কি না।
প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিটি পাঠের সুযোগ আমার হয়েছে। আমার কাজের অংশ হিসেবেই এটি পাঠ করতে হয়েছে, এবং সেটি করতে গিয়ে যা উপলব্ধি করেছি তারই তিনটি এখানে বয়ান করতে চাই।

উপানুষ্ঠানিক ও বয়স্ক শিক্ষা

অধ্যায় ৩-এ বলা হয়েছে উপানুষ্ঠানিক ও বয়স্ক শিক্ষার কথা। আমার মতে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা হলো শিক্ষা দানের পদ্ধতি বিশেষ। অনেক দেশেই একই বিষয়ে পাঠদান করা হয় আনুষ্ঠানিক ও উপানুষ্ঠানিক উভয় ধরনের শিক্ষা পদ্ধতিতে। এই শিক্ষানীতিকে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে স্কুল থেকে ঝড়ে পড়া এবং বিভিন্ন কারণে স্কুলের বাইরে রয়ে যাওয়া শিশু কিশোরদের প্রাথমিক শিক্ষা দেয়াকে। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য বয়সসীমাও বেঁধে দেয়া হয়েছে – ৮ থেকে ১৪ বছরের শিশুরা ভর্তি হতে পারবে এতে। শিক্ষাক্রম হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষার জাতীয় শিক্ষাক্রম অনুসরণ করা হবে, তবে উপকরণ ভিন্ন হবে। বেসরকারী স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলিকে এ ধরনের শিক্ষা প্রদানে উৎসাহিত করা হবে। এই শিক্ষাকে সমন্বয় করার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে নূতন এক সংস্থার: বাংলাদেশ অব্যাহত ও দক্ষতা শিক্ষা সংস্থা। এটি গড়ে উঠবে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো মিলে।
আমার প্রতিক্রিয়া:

  • উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কেন শুধু প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে? এর মাধ্যমে অব্যাহত শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন শিক্ষা অর্৭জন করা সম্ভব হবে না কেন?
  • প্রাথমিক পর্যায়ে ভর্তি ১০০ শতাংশে উন্নীত হলেই কি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা? অন্যান্য দেশ, যেমন থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, যেখানে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাকে বিস্তৃত করে সবার জন্য শিক্ষালাভের সুযোগ করে দিচ্ছে এবং উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সমমানের স্বীকৃতি দিচ্ছে সেখানে বাংলাদেশের শিক্ষানীতিতে এই পেছনে হাঁটা কেন?
  • ২০০৬ সালে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা নীতিমালা গৃহীত হয়। এটির উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা নীতি অনুসারে এই ব্যুরো উপানুষ্ঠানিক ও বয়স্ক শিক্ষার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। উল্লেখ্য যে সরকারে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন সংস্থা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এসব কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় সাধন করাও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর কাজ। ব্যুরো সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে বলেই জানি। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষানীতি অনুসারে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্যেই পড়বে বয়স্ক শিক্ষা, অব্যাহত শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্ন য়ন শিক্ষা। সেই নীতি অনুসারে এসব দেখাশোনা ও সমন্বয়ের দায়িত্ব উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর।  হঠাৎ করে এমন কি ঘটল যে এই দায়িত্ব দেয়ার জন্য নূতন একটি সংস্থা – বাংলাদেশ অব্যাহত ও দক্ষতা শিক্ষা সংস্থা তৈরি করতে হবে? আগের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তর বিলুপ্ত করে দিয়ে আমরা এমনিতেই কয়েক বছর হারিয়েছি, আগের অর্জনসমূহ বিলীন হয়েছে। 
  • প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এমনিতেই বিশাল এক সংস্থা। প্রায় সত্তুর হাজার প্রাথমিক স্কুল নিয়ে এটি এমনিতেই হিমশিম খাচ্ছে। সেখানে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে অন্য কোনো সংস্থার সঙ্গে একীভূত করা হলে কিংবা এর উপর উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার দায়িত্ব চাপানো হলে সেটি হবে আরো বিপর্যয়কর।

দূরশিক্ষণ
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মতোই আরেকটি বিষয় হলো দূরশিক্ষণ। দূর শিক্ষণ এখন বিভিন্ন দেশেই স্বীকৃত পদ্ধতি। দূর শিক্ষণের মাধ্যমে আমাদের দেশের জনগণ শিক্ষার সুযোগ আরো বেশি করে পাবে। দূর শিক্ষন ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ প্রদানের জন্য গড়ে উঠেছিল বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। এটি সফলভাবে বেশ কিছু কোর্সও চালিয়ে এসেছে। ইতোমধ্যে এর কিছু কর্মসসূচি জনপ্রিয়তাও পেয়েছে। এই দূরশিক্ষণের স্বীকৃতি প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিতে নেই। কেবল বলা হয়েছে, সাক্ষরতা কর্মসূচি পরিচালনায় বেতার ও টেলিভিশনের মাধ্যমে দূরশিক্ষণ পদ্ধতিও ব্যবহার করা যেতে পারে (অধ্যায় ৩, পৃ. ১৯)। দূরশিক্ষণকে এভাবেই কেবল সাক্ষরতা কর্মসূচির সাথে যুক্ত করা হয়েছে। উচ্চতর শিক্ষায় এর ব্যবহার সম্পর্কে কোনো নীতি উল্লেখ করা হয়নি।
এ প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলতে চাই। একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক দূরপ্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেছিল। শিক্ষায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে জানতে পারি তাদের কথা। তারা সরকারের অনুমোদন নিয়ে এটি শুরু করেছিল কি না বলতে পারছি না। তবে সম্প্রতি পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে জানতে পারলাম যে সরকারী নির্দেশে এই কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। আমার প্রশ্ন হলো, দূরশিক্ষণ বিষয়ক কোনো নীতিমালা থাকলে সেই নীতিমালা মেনে কেউ কি এটি পরিচালনা করতে পারবে না? যদি কোনো নীতিমালা না থাকে তাহলে সেই নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে না কেন?

তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা এবং শিক্ষায় তথ্যপ্রযুক্তি
প্রস্তাবিত শিক্ষানীতিতে ঘুরে ফিরে বিভিন্নভাবে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার মধ্যে কম্পিউটার শিক্ষাই প্রাধান্য পেয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, সন্দেহ নেই। তবে বিশ্বজুড়ে তথ্যপ্রযুক্তি কেবল একটি বিষয় হিসেবে নয়, টুল হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এই টুল ব্যবহার করা হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থাপনা শিক্ষা দান উভয় ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ শিক্ষায় তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের ব্যাপারে অনেকেই উদ্যোগী। শিক্ষায় তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়ানো যেতে পারে, শিক্ষাদান পদ্ধতিকে আরো সহজবোধ্য, সুলভ ও কার্যকর করা যেতে পারে। শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রশাসনের স্বচ্ছতা বাড়ানো যেতে পারে। শিক্ষা কমিশনের বিজ্ঞ সদস্যবৃন্দ এসব অনুধাবন করতে পারলেও সেখানে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে কিছু বলা নেই। তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার ব্যাপারে এতকিছু বলা হলেই শিক্ষায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে কোনো নীতি এতে উল্লেখ করা হয়নি। যেটি না করলেই ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।

Posted via email from Suhreed Sarkar | the philosopher

One thought on “প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি: তিনটি বিবেচ্য

  1. বাংলাদেশের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে। 

    Nothing can be done quicker. Dreams will come true if we help our government.One after another 1,2,3…….dreams.

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s